তিনি বলেন, ‘সীমিতসংখ্যক বড় করদাতার ওপর নির্ভর করে রাজস্ব আহরণ টেকসই নয়। কর সংস্কৃতির বিস্তার ঘটাতে হবে এবং কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। ‘২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।’
গতকাল রাজধানীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘লুকিং ইনটু বাংলাদেশ’স ডেভেলপমেন্ট: প্রায়োরিটি ফর দ্য নিউলি ইলেক্টেড গভর্নমেন্ট ইন দ্য শর্ট টু মিডিয়াম টার্ম’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সিপিডি ও দ্য ডেইলি স্টার যৌথভাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
আরো বক্তব্য দেন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ, ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, ব্যবসায়ী নেতা ও ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসি বাংলাদেশ) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ, বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মাঈন উদ্দিন, বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক আসিফ ইব্রাহীম, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খান, অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সরকারের ম্যান্ডেটের পাঁচটি মূল ভিত্তি তুলে ধরে বলেন, এগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অন্যতম। তবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঋণের যে পাহাড় গড়ে উঠেছে, তা অর্থনীতিকে এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এ সংকট উত্তরণে সরকার অপচয় রোধ এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছে। উপদেষ্টা আরো বলেন, সামাজিক সুরক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে আমরা ‘ওয়ান সিটিজেন ওয়ান কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করতে যাচ্ছি, যা ডিজিটাল অবকাঠামোর মাধ্যমে সহায়তার ক্ষেত্রে অপচয় কমাতে সাহায্য করবে। বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকিকে ‘অসহনীয়’ উল্লেখ করে রাশেদ আল মাহমুদ বলেন, এ ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। এ ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ চুক্তি পুনঃআলোচনা, সিস্টেম লস কমানো এবং দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘কেবল ভালো নীতি গ্রহণ করলেই হবে না, সঠিক বাস্তবায়ন জরুরি। ঔপনিবেশিক আমলের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং অতিরিক্ত দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় অনেক বেড়ে যায়, যা সরকারের লক্ষ্য অর্জনে বাধা সৃষ্টি করে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা ডিজিটালাইজ করতে হবে। এটি কেবল আর্থিক লেনদেনে সীমাবদ্ধ না রেখে সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করলে কাজের দক্ষতা বাড়বে এবং অপচয় কমবে।’
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ফিরে আসবে না। বর্তমানে গড় ঋণখেলাপির হার ৩৬ শতাংশ এবং সরকারি ব্যাংকগুলোতে তা প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ টাকাগুলো কারা নিয়েছে? যারা উইলফুল ডিফল্টার, তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি এক্সিট পলিসি দিয়েছে, আমরা সেটাকে সমর্থন করি। কিন্তু যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। না হলে অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না।’
ফাহমিদা খাতুন জানান, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে তিন দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শিল্প ও সেবা খাতে গতি কমে যাওয়া এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এ পতনের বড় কারণ। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি বেড়ে চার দশমিক ৫০ শতাংশে উঠেছে। এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও তা এখনো স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি গত দুই বছরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ অর্থবছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে আট দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে।’
কিন্তু একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ১২ শতাংশে স্থির রয়েছে। ফলে প্রকৃত আয় বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মূল্যস্ফীতি কমলেই হবে না, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে। মূল্যস্ফীতির হার কমার প্রবণতা দেখা গেলেও এর গতি শ্লথ। বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে; যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে সিপিডি।